ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ বা আইপিএল-এর মঞ্চে বাংলাদেশ বললেই যে নামটি সবার আগে আসে, তিনি সাকিব আল হাসান। ২০১১ সালে কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে যাত্রা শুরু করে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা ‘ভ্যালুয়েবল’ ক্রিকেটার হিসেবে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যেমন তিনি অলরাউন্ডার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তেমনি বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল)–এও তাঁর অবদান স্মরণীয়। ব্যাটে-বলে সমান দক্ষ এই কিংবদন্তি অলরাউন্ডারের আইপিএল ক্যারিয়ার নানা উত্থান-পতন, সাফল্য ও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ভরপুর।

কলকাতা নাইট রাইডার্স এ সাকিব আল হাসান
আইপিএল-এ সাকিব আল হাসান এবং কলকাতা নাইট রাইডার্স (KKR) যেন একে অপরের পরিপূরক। ২০১১ সালে শাহরুখ খানের দলে যোগ দেওয়ার পর থেকে সাকিব কেকেআর-এর ঘরের ছেলে হয়ে ওঠেন। আইপিএল-এ অনেক দল থাকলেও সাকিব আল হাসানের হৃদয়ের খুব কাছের দল হলো কলকাতা নাইট রাইডার্স (KKR)। ২০১১ থেকে ২০১৭ এবং পুনরায় ২০২১ সালে তিনি এই ফ্র্যাঞ্চাইজির হয়ে মাঠ মাতিয়েছেন। কেকেআর-এর দুটি শিরোপা জয়েই সাকিবের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। প্রথম সিজনেই ৭ ম্যাচে ১১ উইকেট নিয়ে তিনি নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন। তবে ২০১২ সিজন ছিল তার জন্য স্বপ্নের মতো। চেন্নাই সুপার কিংসের বিপক্ষে ফাইনালে বল হাতে গুরুত্বপূর্ণ উইকেট এবং শেষে ব্যাটিংয়ে এসে ৭ বলে ১১* রানের ছোট কিন্তু কার্যকর ক্যামিও খেলে কেকেআর-কে প্রথম শিরোপা জেতাতে সাহায্য করেন। ২০১৪ সালে কেকেআর যখন দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন হয়, তখন সাকিব ছিলেন দলের অন্যতম প্রাণভ্রমরা। এই সিজনে তিনি ২২৭ রান করেন (স্ট্রাইক রেট ১৪৯.৩৪)। ১১ উইকেট নিয়ে প্রতিপক্ষের রান আটকে রাখতে বড় ভূমিকা পালন করেন।
কলকাতার ঘরের মাঠ ইডেন গার্ডেন্সের স্পিন সহায়ক উইকেটে সাকিব ছিলেন গৌতম গম্ভীরের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। সুনীল নারাইন এবং সাকিবের স্পিন জুটি আইপিএল-এর অন্যতম ভয়ঙ্কর জুটি হিসেবে পরিচিত ছিল।
সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদে সাকিব আল হাসান: একজন নীরব নায়ক
আইপিএলের ইতিহাসে সাকিব আল হাসান এমন একজন অলরাউন্ডার, যিনি সংখ্যার চেয়েও প্রভাবের মাধ্যমে ম্যাচে ছাপ রেখেছেন। সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ (SRH) দলে তার সময়টা খুব দীর্ঘ না হলেও, ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয়। সাকিব আল হাসান ২০১৬ ও ২০১৭ মৌসুমে সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদের হয়ে আইপিএল খেলেন। এই সময়েই SRH তাদের ইতিহাসের একমাত্র আইপিএল শিরোপা জয় করে। সাকিব মূলত দলে জায়গা করে নিয়েছিলেন একজন ইকোনোমিক লেফট-আর্ম স্পিনার হিসেবে। মিডল ওভারে রান আটকে রেখে উইকেট নেওয়াই ছিল তার প্রধান দায়িত্ব। বড় নাম না হলেও চাপের মুহূর্তে নির্ভরযোগ্য অপশন ছিলেন সাকিব। ব্যাট হাতে সাকিবকে খুব বেশি রান করতে দেখা না গেলেও, মিডল অর্ডারে ইনিংস স্থিতিশীল করার ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। দলের প্রয়োজন অনুযায়ী ছোট কিন্তু কার্যকর ইনিংস খেলাই ছিল তার মূল লক্ষ্য।
সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদের ২০১৬ আইপিএল শিরোপা জয়ে সাকিবের ভূমিকা
২০১৬ সালের আইপিএলে সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ যখন চ্যাম্পিয়ন হয়, তখন দলে ছিলেন ডেভিড ওয়ার্নার, ভুবনেশ্বর কুমার, মুস্তাফিজুর রহমানের মতো তারকারা। এই তারকাদের আড়ালে থেকে সাকিব আল হাসান নীরবে নিজের কাজটি করে গেছেন। যেমন রান আটকে রাখা, গুরুত্বপূর্ণ উইকেট নেওয়া এবং দলকে ভারসাম্য দেওয়া। সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদে সাকিব আল হাসানের সময়টা হয়তো পরিসংখ্যানের দিক থেকে খুব ঝলমলে নয়, কিন্তু দলের সাফল্যে তার অবদান ছিল বাস্তব ও কার্যকর। একজন প্রকৃত অলরাউন্ডার হিসেবে তিনি প্রমাণ করেছেন—সব অবদান আলোচনায় আসে না, কিন্তু সব অবদানই গুরুত্বপূর্ণ।
সাকিব আল হাসানের ব্যাটিং পরিসংখ্যান (আইপিএল ২০১১-২০২১)
সাকিব মূলত একজন অলরাউন্ডার হিসেবে মিডল অর্ডারে খেলতেন। তার ব্যাটিং পরিসংখ্যান নিচের টেবিলে দেওয়া হলো:
| সিজন | দল | ম্যাচ | ইনিংস | রান | সর্বোচ্চ | গড় | স্ট্রাইক রেট | ৫০/১০০ | ৪/৬ |
| ২০১১ | কেকেআর | ৭ | ৪ | ২৯ | ২৬ | ৭.২৫ | ৯৬.৬৬ | ০/০ | ১/১ |
| ২০১২ | কেকেআর | ৮ | ৭ | ৯১ | ৪২ | ১৮.২০ | ১২৪.৬৫ | ০/০ | ৯/১ |
| ২০১৪ | কেকেআর | ১৩ | ১১ | ২২৭ | ৬০ | ৩২.৪২ | ১৪৯.৩৪ | ১/০ | ২২/৭ |
| ২০১৫ | কেকেআর | ৪ | ৩ | ৩৬ | ২৩ | ১২.০০ | ১০৫.৮৮ | ০/০ | ৩/১ |
| ২০১৬ | কেকেআর | ১০ | ৬ | ১১৪ | ৬৬* | ২৮.৫০ | ১০৭.৫৪ | ১/০ | ১০/২ |
| ২০১৭ | কেকেআর | ১ | ১ | ১ | ১* | – | ৫০.০০ | ০/০ | ০/০ |
| ২০১৮ | এসআরএইচ | ১৭ | ১৩ | ২৩৯ | ৩৫ | ২১.৭২ | ১২১.৩১ | ০/০ | ২৫/৬ |
| ২০১৯ | এসআরএইচ | ৩ | ২ | ৯ | ৯ | ৪.৫০ | ৯০.০০ | ০/০ | ১/০ |
| ২০২১ | কেকেআর | ৮ | ৮ | ৪৭ | ২৬ | ৯.৪০ | ৯৭.৯১ | ০/০ | ২/৩ |
| মোট | — | ৭১ | ৫৫ | ৭৯৩ | ৬৬* | ১৯.৮৩ | ১২৪.৪৯ | ২/০ | ৭৩/২১ |
সাকিব আল হাসানের বোলিং পরিসংখ্যান (আইপিএল ২০১১-২০২১)
বাঁহাতি স্পিনার হিসেবে সাকিবের ইকোনমি রেট সবসময়ই দুর্দান্ত ছিল। তার বোলিং পরিসংখ্যান নিচে দেওয়া হলো:
| সিজন | দল | ম্যাচ | ওভার | উইকেট | সেরা স্পেল | গড় | ইকোনমি | ডট বল |
| ২০১১ | কেকেআর | ৭ | ২৭.০ | ১১ | ৩/২৮ | ১৫.৯০ | ৬.৮৬ | ৬৬ |
| ২০১২ | কেকেআর | ৮ | ৩১.২ | ১২ | ৩/১৭ | ১৭.০০ | ৬.৫০ | ৬০ |
| ২০১৪ | কেকেআর | ১৩ | ৪৬.০ | ১১ | ২/২২ | ২৮.০০ | ৬.৬৮ | ১০০ |
| ২০১৫ | কেকেআর | ৪ | ৯.০ | ৪ | ২/২২ | ১৯.৭৫ | ৮.৭৯ | ১৩ |
| ২০১৬ | কেকেআর | ১০ | ৩২.০ | ৫ | ১/১৪ | ৫০.২০ | ৭.৮৪ | ৬৭ |
| ২০১৭ | কেকেআর | ১ | ৩.০ | ০ | ০/৩১ | – | ১০.৩৩ | ৩ |
| ২০১৮ | এসআরএইচ | ১৭ | ৫৪.০ | ১৪ | ২/১৮ | ৩০.৮৫ | ৮.০০ | ১১৯ |
| ২০১৯ | এসআরএইচ | ৩ | ৯.৫ | ২ | ১/২৬ | ৪৩.৫০ | ৮.৭৭ | ১৯ |
| ২০২১ | কেকেআর | ৮ | ২৪.০ | ৪ | ১/১ | ৪৩.২৫ | ৭.১৯ | ৬৪ |
| মোট | — | ৭১ | ২৩৬.১ | ৬৩ | ৩/১৭ | ২৯.১৯ | ৭.৪৪ | ৫১১ |
জাতীয় দলের ব্যস্ততা, ইনজুরি ও বিভিন্ন বাস্তবতার কারণে সাকিব আইপিএলে নিয়মিত খেলতে পারেননি। তবুও যতবার সুযোগ পেয়েছেন, ততবারই নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। আইপিএলে তাঁর নাম এলেই প্রতিপক্ষ দল তাঁকে বিশেষ পরিকল্পনায় রাখত—এটাই একজন কিংবদন্তি অলরাউন্ডারের পরিচয়। কিংবদন্তি অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের আইপিএল ক্যারিয়ার সংখ্যার বিচারে হয়তো দীর্ঘ নয়, কিন্তু প্রভাবের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রমাণ করেছেন, বাংলাদেশ থেকেও বিশ্বমানের অলরাউন্ডার উঠে এসে আইপিএলের মতো মঞ্চে নিজের ছাপ রাখতে পারে।
আইপিএলের ইতিহাসে সাকিব আল হাসান চিরকালই স্মরণীয় থাকবেন একজন বুদ্ধিদীপ্ত, কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য অলরাউন্ডার হিসেবে।
সাকিব আল হাসানকে নিয়ে কিছু প্রশ্ন ও উত্তর
সাকিব আল হাসানের আইপিএল ক্যারিয়ার নিয়ে কিছু প্রশ্ন ও উত্তর
সাকিব আল হাসান কি আইপিএল ট্রফি জিতেছেন?
হ্যাঁ, সাকিব আল হাসান ২০১২ সালে কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে আইপিএল শিরোপা জেতেন।
আইপিএলে সাকিব আল হাসান কেন একজন গুরুত্বপূর্ণ অলরাউন্ডার?
কারণ তিনি ব্যাটিং ও বোলিং—দুই বিভাগেই কার্যকর। চাপের মুহূর্তে রান করা, পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট নেওয়ার ক্ষমতা তাঁকে একজন মূল্যবান অলরাউন্ডারে পরিণত করেছে।
ভবিষ্যতে কি সাকিব আল হাসান আবার আইপিএলে খেলতে পারেন?
এটি নির্ভর করে দল নির্বাচন, ফিটনেস এবং আন্তর্জাতিক সূচির ওপর। তবে সাকিব আল হাসানের অভিজ্ঞতা তাঁকে এখনো আইপিএলের জন্য মূল্যবান করে তোলে।



