আইসিসি টি২০ বিশ্বকাপ হলো ক্রিকেট জগতের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর টুর্নামেন্ট। মাত্র ২০ ওভারের খেলায় বড় বড় দল, তারকা খেলোয়াড় এবং নাটকীয় মুহূর্ত সবকিছু মিলিয়ে এই টুর্নামেন্ট ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে আলাদা উত্তেজনার নাম। ২০০৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম আয়োজিত এই টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত ৯টি আসর অনুষ্ঠিত হয়েছে। তিনটি দেশ দুইবার করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে – ইন্ডিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং ইংল্যান্ড। আর পাকিস্তান, শ্রীলংকা ও অস্ট্রেলিয়া একবার করে শিরোপা জিতেছে, তবে ২০২৩ সালের বিশ্বকাপের পর ২০২৩ সালের টি২০ বিশ্বকাপ কোন দল কতবার নিয়েছে (২০২৪ এ অনুষ্ঠিত) ভারত তাদের দ্বিতীয় শিরোপা জিতেছে এবং বর্তমানে তারাই চ্যাম্পিয়ন, যেখানে ভারত ও শ্রীলঙ্কা ২০২৬ সালের আয়োজক, যা এই টুর্নামেন্টের ১০ম আসর হতে চলেছে।

একনজরে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বিজয়ীদের তালিকা
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ইতিহাস মানেই রোমাঞ্চ, নাটকীয়তা আর শেষ মুহূর্তের উত্তেজনা। ২০০৭ সালে এই টুর্নামেন্টের যাত্রা শুরু হওয়ার পর থেকে ক্রিকেট বিশ্ব পেয়েছে নতুন নতুন চ্যাম্পিয়ন। এখন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ৯টি আসরে মোট ৬টি দেশ শিরোপার স্বাদ গ্রহণ করেছে। নিচের টেবিলে ২০০৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সকল বিজয়ীর সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান দেওয়া হলো:
| সাল | আয়োজক দেশ | চ্যাম্পিয়ন | রানার-আপ | ব্যবধান |
| ২০০৭ | দক্ষিণ আফ্রিকা | ভারত | পাকিস্তান | ৫ রান |
| ২০০৯ | ইংল্যান্ড | পাকিস্তান | শ্রীলঙ্কা | ৮ উইকেট |
| ২০১০ | ওয়েস্ট ইন্ডিজ | ইংল্যান্ড | অস্ট্রেলিয়া | ৭ উইকেট |
| ২০১২ | শ্রীলঙ্কা | ওয়েস্ট ইন্ডিজ | শ্রীলঙ্কা | ৩৬ রান |
| ২০১৪ | বাংলাদেশ | শ্রীলঙ্কা | ভারত | ৬ উইকেট |
| ২০১৬ | ভারত | ওয়েস্ট ইন্ডিজ | ইংল্যান্ড | ৪ উইকেট |
| ২০২১ | ইউএই ও ওমান | অস্ট্রেলিয়া | নিউজিল্যান্ড | ৮ উইকেট |
| ২০২২ | অস্ট্রেলিয়া | ইংল্যান্ড | পাকিস্তান | ৫ উইকেট |
| ২০২৪ | উইন্ডিজ ও ইউএসএ | ভারত | দক্ষিণ আফ্রিকা | ৭ রান |
টি ২০ বিশ্বকাপ কে কতবার নিয়েছে – দল ভিত্তিক
টি২০ বিশ্বকাপের শিরোপা জয়ের তালিকা প্রমাণ করে, এই ফরম্যাটে কোনো দলই চিরস্থায়ী আধিপত্য ধরে রাখতে পারে না। অল্প ওভারের এই খেলায় প্রতিটি ম্যাচেই থাকে অপ্রত্যাশিত ফলের সম্ভাবনা, যা টুর্নামেন্টটিকে আরও রোমাঞ্চকর করে তোলে। সময়ের সাথে টি২০ বিশ্বকাপের শিরোপা জয়ের লড়াই দিন দিন আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠছে।
| দেশের নাম | শিরোপা সংখ্যা | জয়ের বছর |
| ভারত | ২ বার | ২০০৭, ২০২৪ |
| ওয়েস্ট ইন্ডিজ | ২ বার | ২০১২, ২০১৬ |
| ইংল্যান্ড | ২ বার | ২০১০, ২০২২ |
| পাকিস্তান | ১ বার | ২০০৯ |
| শ্রীলঙ্কা | ১ বার | ২০১৪ |
| অস্ট্রেলিয়া | ১ বার | ২০২১ |
টি ২০ বিশ্বকাপে উল্লেখযোগ্য রেকর্ড
আইসিসি টি২০ বিশ্বকাপ মানেই রোমাঞ্চ, নাটকীয়তা আর ইতিহাস গড়া পারফরম্যান্স। এই টুর্নামেন্টে কিছু ব্যক্তিগত ও দলগত রেকর্ড রয়েছে, যা বছরের পর বছর ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে গেঁথে আছে। নিচে টি২০ বিশ্বকাপের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রেকর্ডগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—
| রেকর্ড | নাম / দল | পরিসংখ্যান |
|---|---|---|
| সর্বাধিক রান | বিরাট কোহলি | ১,২৯২ রান (৩৫ ম্যাচ) |
| সর্বাধিক উইকেট | শাকিব আল হাসান | ৫০ উইকেট (৪৩ ম্যাচ) |
| সর্বাধিক ফাইনাল | শ্রীলঙ্কা, ইংল্যান্ড, পাকিস্তান, ভারত | ৩ বার করে |
| সর্বাধিক সেমিফাইনাল | পাকিস্তান | ৬ বার |
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরের ছোট বর্ণনা
১. ২০০৭: ভারতের ঐতিহাসিক জয়
দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত প্রথম আসরেই ক্রিকেট বিশ্ব দেখেছিল এক মহাকাব্যিক লড়াই। ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ও পাকিস্তান। মহেন্দ্র সিং ধোনির তরুণ ভারতের দেওয়া ১৫৮ রানের টার্গেটে পাকিস্তান প্রায় পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু শেষ ওভারে জোগিন্দর শর্মার বলে মিসবাহ-উল-হকের সেই স্কুপ শট শ্রীশান্তের হাতে ধরা পড়তেই ইতিহাস গড়ে ভারত। ৫ রানে জিতে প্রথম চ্যাম্পিয়ন হয় টিম ইন্ডিয়া।
আরও পড়ুন: জো রুট পরিসংখ্যান ২০২৬
২. ২০০৯: পাকিস্তানের প্রতিশোধ ও সাফল্য
২০১০ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজে অনুষ্ঠিত আসরে ইংল্যান্ড তাদের ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম কোনো আইসিসি ট্রফি জেতে। পল কলিংউডের নেতৃত্বে ইংল্যান্ড ফাইনালে চিরশত্রু অস্ট্রেলিয়াকে ৭ উইকেটে পরাজিত করে। কেভিন পিটারসেন সেই টুর্নামেন্টে অবিশ্বাস্য ফর্মে ছিলেন।
৪. ২০১২: ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ‘গ্যাংনাম স্টাইল’
শ্রীলঙ্কার মাটিতে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে নিজেদের প্রথম শিরোপা জেতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। মারলন স্যামুয়েলসের ৭৮ রানের বিধ্বংসী ইনিংসে ভর করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ স্বল্প পুঁজি নিয়েও ৩৬ রানে জয় পায়। ড্যারেন স্যামির সেই দলের ‘গ্যাংনাম স্টাইল’ নাচ আজও সমর্থকদের মনে গেঁথে আছে।
৫. ২০১৪: শ্রীলঙ্কার অপেক্ষার অবসান
টানা তিনটি ফাইনাল (২০০৯ টি-টোয়েন্টি, ২০১১ ওয়ানডে, ২০১২ টি-টোয়েন্টি) হারের পর অবশেষে ২০১৪ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত আসরে শিরোপা জেতে শ্রীলঙ্কা। ফাইনালে ভারতকে মাত্র ১৩০ রানে আটকে দেয় লঙ্কান বোলাররা। কুমার সাঙ্গাকারার বিদায়ী ম্যাচে শ্রীলঙ্কা ৬ উইকেটে জয়ী হয়।
৬. ২০১৬: ‘রিমেম্বার দ্য নেম’ – কার্লোস ব্র্যাথওয়েট
ভারতের ইডেন গার্ডেন্সে অনুষ্ঠিত এই ফাইনালটি ছিল ক্রিকেটের অন্যতম রোমাঞ্চকর। শেষ ওভারে জয়ের জন্য ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রয়োজন ছিল ১৯ রান। বেন স্টোকসের প্রথম চার বলে টানা চারটি ছক্কা মেরে কার্লোস ব্র্যাথওয়েট ওয়েস্ট ইন্ডিজকে দ্বিতীয় শিরোপা এনে দেন। ধারাভাষ্যকার ইয়ান বিশপের সেই বিখ্যাত উক্তি— “Remember the name, Carlos Brathwaite!” এখনও কানে বাজে।
৭. ২০২১: অস্ট্রেলিয়ার অধরা শিরোপা জয়
দীর্ঘ বিরতির পর মরুভূমিতে (ইউএই) অনুষ্ঠিত আসরে অস্ট্রেলিয়া তাদের প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ঘরে তোলে। অ্যারন ফিঞ্চের নেতৃত্বে অস্ট্রেলিয়া ফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে ৮ উইকেটে হারিয়ে দেয়। মিচেল মার্শের দুর্দান্ত ব্যাটিং তাদের জয় সহজ করে দিয়েছিল।
৮. ২০২২: ইংল্যান্ডের ডাবল মুকুট
বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হিসেবে অস্ট্রেলিয়াতে খেলতে আসা ইংল্যান্ড দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা জেতে। বেন স্টোকসের দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে ফাইনালে তারা পাকিস্তানকে ৫ উইকেটে হারায়। এর মাধ্যমে ইংল্যান্ড একই সাথে ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি দুই ফরম্যাটের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার নজির গড়ে।
৯. ২০২৪: ভারতের দ্বিতীয় রাজত্ব
২০২৪ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ভারত তাদের দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শিরোপা জেতে। ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে হারতে বসা ম্যাচটি জসপ্রীত বুমরাহ ও হার্দিক পান্ডিয়ার অবিশ্বাস্য বোলিংয়ে ৭ রানে জিতে নেয় ভারত। সূর্যকুমার যাদবের সেই ঐতিহাসিক ক্যাচ ভারতকে শিরোপা জেতাতে সাহায্য করে।
উপসংহার
টি২০ বিশ্বকাপ ক্রিকেট জগতে এক বিপ্লব এনেছে। মাত্র ১৭ বছরে এই টুর্নামেন্ট ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় ইভেন্ট হয়ে উঠেছে। ছয়টি ভিন্ন দেশের চ্যাম্পিয়ন হওয়া প্রমাণ করে যে টি২০ ক্রিকেট কতটা প্রতিযোগিতামূলক এবং অনিশ্চিত।
ভারত, ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং ইংল্যান্ড – এই তিন দেশই দুইবার করে চ্যাম্পিয়ন হয়ে তাদের আধিপত্য প্রমাণ করেছে। তবে পাকিস্তান, শ্রীলংকা এবং অস্ট্রেলিয়ার একবার করে জয়ও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রতিটি টুর্নামেন্টে নতুন নায়ক, নতুন রেকর্ড এবং অবিশ্বাস্য সব মুহূর্ত তৈরি হয়েছে যা ক্রিকেটপ্রেমীদের হৃদয়ে চিরকাল স্থান করে নিয়েছে।
২০২৬ সালে ভারত-শ্রীলংকায় আগামী টুর্নামেন্টে আবারও নতুন ইতিহাস রচিত হবে। কোন দেশ তৃতীয়বারের জন্য চ্যাম্পিয়ন হবে নাকি নতুন কোনো দেশ শিরোপা তুলবে – তা দেখার জন্য সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।



