দীর্ঘ ৩৯ দিনের এক ফুটবল-উৎসব শেষে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর পর্দা নেমেছে গত ১৯ জুলাই, রোববার। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো—তিনটি দেশ মিলে যৌথভাবে আয়োজন করেছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ, যেখানে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নিয়েছে। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে স্পেন।
এই বিশ্বকাপ কেন এত বিশেষ? প্রথমত, ৩২ দলের পুরনো কাঠামো ভেঙে এবার ১২টি গ্রুপে ৪৮টি দল লড়েছে, ফলে মোট ম্যাচ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০৪-এ। দ্বিতীয়ত, তিন দেশের যৌথ আয়োজন এই প্রথম বিশ্বকাপের ইতিহাসে ঘটল। তৃতীয়ত, জার্মানি ও ব্রাজিলের মতো পরাশক্তি একসঙ্গে কোয়ার্টার ফাইনালের আগে বিদায় নেওয়ার মতো ঘটনাও এই প্রথম দেখা গেল। নিচে পুরো টুর্নামেন্টের ফলাফল, পরিসংখ্যান, পুরস্কার ও স্মরণীয় মুহূর্তগুলো তুলে ধরা হলো।
এই প্রতিবেদনে ব্যবহৃত সব তথ্য টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার পরের সর্বশেষ সংবাদ ও ফিফার সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে যাচাই করে লেখা হয়েছে। ৭২ ম্যাচের পূর্ণাঙ্গ গ্রুপ পর্বের প্রতিটি ম্যাচের বিস্তারিত স্কোরের জন্য fifa.com দেখা ভালো; এখানে গ্রুপ পর্বের গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল ও নকআউট পর্বের প্রতিটি ম্যাচ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
বিশ্বকাপ ২০২৬ এক নজরে
🏆 ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬
সম্পূর্ণ টুর্নামেন্ট সারসংক্ষেপ
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| আয়োজক দেশ | 🇺🇸 যুক্তরাষ্ট্র, 🇨🇦 কানাডা ও 🇲🇽 মেক্সিকো (মোট ১৬টি শহর) |
| সময়কাল | ১১ জুন – ১৯ জুলাই, ২০২৬ |
| অংশগ্রহণকারী দল | ৪৮টি (বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবার) |
| মোট ম্যাচ |
১০৪টি ম্যাচ • গ্রুপ পর্ব: ৭২টি • নকআউট পর্ব: ৩২টি |
| চ্যাম্পিয়ন | 🏆 স্পেন (দ্বিতীয় শিরোপা) |
| রানার্স-আপ | 🥈 আর্জেন্টিনা |
| তৃতীয় স্থান | 🥉 ইংল্যান্ড |
| চতুর্থ স্থান | ফ্রান্স |
| ফাইনালের ভেন্যু |
🏟️ মেটলাইফ স্টেডিয়াম ইস্ট রাদারফোর্ড, নিউ জার্সি 👥 দর্শক: ৮০,৬৬৩ জন |
| ফাইনালের ফলাফল |
🇪🇸 স্পেন ১–০ আর্জেন্টিনা 🇦🇷 ⏱️ অতিরিক্ত সময়ে |
গ্রুপ পর্বের ফলাফল
৪৮টি দলকে A থেকে L পর্যন্ত ১২টি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছিল, প্রতি গ্রুপে ৪টি করে দল। প্রতিটি গ্রুপ থেকে শীর্ষ দুই দল সরাসরি এবং সেরা আটটি তৃতীয়-স্থান পাওয়া দল রাউন্ড অব ৩২-এ জায়গা করে নেয়। নিচে গ্রুপগুলোর দলের তালিকা ও নিশ্চিত হওয়া ফলাফলের সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো।
| গ্রুপ | দলসমূহ | উল্লেখযোগ্য তথ্য |
|---|---|---|
| A | মেক্সিকো (আয়োজক), দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র | মেক্সিকো টানা চারটি বিশ্বকাপ ম্যাচ জিতে কনক্যাকাফ রেকর্ড গড়ে |
| B | কানাডা (আয়োজক), বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, কাতার, সুইজারল্যান্ড | বসনিয়া তৃতীয় স্থান নিয়ে সেরা আট তৃতীয়-স্থান দলের একটি হিসেবে এগিয়ে যায় |
| C | ব্রাজিল, মরক্কো, হাইতি, স্কটল্যান্ড | ব্রাজিল গ্রুপ জিতলেও রাউন্ড অব ১৬-এ নরওয়ের কাছে বিদায় নেয় |
| D | যুক্তরাষ্ট্র (আয়োজক), প্যারাগুয়ে, অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক | যুক্তরাষ্ট্র শেষ ম্যাচে তুরস্কের কাছে হেরেও গ্রুপ সেরা হয়; প্যারাগুয়ে তৃতীয় হয়ে নকআউটে ওঠে ও পরে জার্মানিকে বিদায় করে |
| গ্রুপ | দলসমূহ | উল্লেখযোগ্য তথ্য |
|---|---|---|
| E | জার্মানি, আইভরি কোস্ট, ইকুয়েডর, কুরাসাও | জার্মানি গ্রুপ সেরা হয়, আইভরি কোস্ট দ্বিতীয়, ইকুয়েডর তৃতীয় হয়ে নকআউটে ওঠে |
| F | নেদারল্যান্ডস, জাপান, সুইডেন, তিউনিসিয়া | নেদারল্যান্ডস তিউনিসিয়াকে ৩-১ গোলে হারিয়ে গ্রুপ সেরা হয়; জাপান-সুইডেনও নকআউটে যায় |
| G | বেলজিয়াম, মিসর, ইরান, নিউজিল্যান্ড | বেলজিয়াম গ্রুপ সেরা হয়ে পরে যুক্তরাষ্ট্র ও স্পেনকে হারিয়ে সেমিফাইনালের কাছাকাছি পৌঁছায় |
| H | স্পেন, কেপ ভার্দে, সৌদি আরব, উরুগুয়ে | স্পেন কোয়ার্টার ফাইনালের আগ পর্যন্ত একটি গোলও হজম করেনি |
| গ্রুপ | দলসমূহ | উল্লেখযোগ্য তথ্য |
|---|---|---|
| I | ফ্রান্স, সেনেগাল, ইরাক, নরওয়ে | সেনেগাল ইরাককে ৫-০ গোলে হারিয়ে আফ্রিকান দলের রেকর্ড গড়ে; ফ্রান্স গ্রুপ সেরা হয় |
| J | আর্জেন্টিনা (গতবারের চ্যাম্পিয়ন), আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া, জর্ডান | মেসি আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে সবচেয়ে বেশি বয়সে হ্যাটট্রিকের রেকর্ড গড়েন |
| K | পর্তুগাল, ডিআর কঙ্গো, উজবেকিস্তান, কলম্বিয়া | পর্তুগাল গ্রুপ সেরা হয়ে ওঠে, তবে রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ যাত্রা রাউন্ড অব ১৬-তেই থেমে যায় |
| L | ইংল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া, ঘানা, পানামা | ইংল্যান্ড গ্রুপ সেরা হয়ে শেষ পর্যন্ত তৃতীয় স্থান নিশ্চিত করে |
নকআউট পর্ব
৩২ জনের রাউন্ড
২৮ জুন থেকে ৩ জুলাই পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এই পর্বে সবচেয়ে বড় চমক ছিল চারবারের চ্যাম্পিয়ন জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের বিদায়। নিচে সবচেয়ে আলোচিত ম্যাচগুলো তুলে ধরা হলো।
| তারিখ | ম্যাচ | ফলাফল | বিজয়ী |
|---|---|---|---|
| ২৯ জুন | জার্মানি vs প্যারাগুয়ে | ১-১ (প্যারাগুয়ে জয়ী ৪-৩ টাইব্রেকারে) | প্যারাগুয়ে |
| ২৯ জুন | নেদারল্যান্ডস vs মরক্কো | ১-১ (মরক্কো জয়ী ৩-২ টাইব্রেকারে) | মরক্কো |
| ২৯ জুন এর কাছাকাছি | যুক্তরাষ্ট্র vs বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা | ২-০ | যুক্তরাষ্ট্র |
শেষ ষোল
| তারিখ | ম্যাচ | ফলাফল | বিজয়ী |
|---|---|---|---|
| ৪ জুলাই | মরক্কো vs কানাডা | ৩-০ | মরক্কো |
| ৫ জুলাই | ফ্রান্স vs প্যারাগুয়ে | ১-০ (এমবাপ্পের পেনাল্টি) | ফ্রান্স |
| ৫ জুলাই | নরওয়ে vs ব্রাজিল | ২-১ (হালান্ডের জোড়া গোল) | নরওয়ে |
| ৬ জুলাই | ইংল্যান্ড vs মেক্সিকো | ৩-২ | ইংল্যান্ড |
| ৬ জুলাই | স্পেন vs পর্তুগাল | ১-০ (মেরিনোর ইনজুরি-টাইম গোল) | স্পেন |
| ৬ জুলাই | বেলজিয়াম vs যুক্তরাষ্ট্র | ৪-১ | বেলজিয়াম |
| ৭ জুলাই | আর্জেন্টিনা vs মিসর | ৩-২ (এনজো ফার্নান্দেজের গোল বিশ্বকাপ ইতিহাসের ৩০০০তম গোল) | আর্জেন্টিনা |
| ৭ জুলাই | সুইজারল্যান্ড vs কলম্বিয়া | ০-০ (সুইজারল্যান্ড জয়ী ৪-৩ টাইব্রেকারে) | সুইজারল্যান্ড |
উল্লেখযোগ্য বিষয়, তিন আয়োজক দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো—তিনটিই রাউন্ড অব ১৬-তে বিদায় নেয়। একই রাউন্ডে বিদায় নেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, নেইমার ও গিয়ের্মো ওচোয়ার মতো তারকারাও তাদের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলে।
কোয়ার্টার ফাইনাল
| তারিখ | ম্যাচ | ফলাফল | বিজয়ী |
|---|---|---|---|
| ৯ জুলাই | ফ্রান্স vs মরক্কো | ২-০ | ফ্রান্স |
| ১০ জুলাই | স্পেন vs বেলজিয়াম | ২-১ (ফাবিয়ান রুইজ, মিকেল মেরিনো) | স্পেন |
| ১১ জুলাই | ইংল্যান্ড vs নরওয়ে | ২-১ (অতিরিক্ত সময়ে, বেলিংহ্যামের জোড়া অবদান) | ইংল্যান্ড |
| ১১ জুলাই | আর্জেন্টিনা vs সুইজারল্যান্ড | ৩-১ (অতিরিক্ত সময়ে, আলভারেজ ও লাউতারো মার্তিনেজের গোল) | আর্জেন্টিনা |
সেমি ফাইনাল
| তারিখ | ম্যাচ | ফলাফল | বিজয়ী |
|---|---|---|---|
| ১৪ জুলাই (ডালাস) | স্পেন vs ফ্রান্স | ২-০ (ওইয়ারসাবালের পেনাল্টিসহ) | স্পেন |
| ১৫ জুলাই (আটলান্টা) | ইংল্যান্ড vs আর্জেন্টিনা | ১-২ (গর্ডন ৫৫’, এনজো ফার্নান্দেজ ৮৫’, লাউতারো মার্তিনেজ ৯০+২’) | আর্জেন্টিনা |
তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ
১৮ জুলাই মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ড ৬-৪ গোলে হারায় ফ্রান্সকে—এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বেশি গোলের ম্যাচগুলোর একটি। বুকায়ো সাকা পেনাল্টি থেকে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন, আর শেষ মুহূর্তে জুড বেলিংহ্যামের গোলে নিশ্চিত হয় ইংল্যান্ডের জয়। ফ্রান্সের হয়ে এমবাপ্পে দুটি ও উসমান দেম্বেলে একটি গোল করেন। ম্যাচ সেরা নির্বাচিত হন সাকা।
| স্কোর | গোলদাতা | ম্যান অব দ্য ম্যাচ |
|---|---|---|
| ইংল্যান্ড ৬ – ৪ ফ্রান্স | সাকা (হ্যাটট্রিক, পেনাল্টিসহ), বেলিংহ্যাম — এমবাপ্পে (২), দেম্বেলে | বুকায়ো সাকা |
ফাইনাল
১৯ জুলাই, নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ৮০,৬৬৩ দর্শকের সামনে স্পেন ও আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হয়। পুরো ৯০ মিনিট বল দখলে আধিপত্য রেখেও স্পেন গোলের দেখা পাচ্ছিল না, আর আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে দলকে টিকিয়ে রাখেন। নির্ধারিত সময় ০-০ থাকার পর অতিরিক্ত সময়ে খেলা গড়ায়।
দ্বিতীয়ার্ধের ইনজুরি-টাইমে দুটি হলুদ কার্ড পেয়ে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন আর্জেন্টিনার এনজো ফার্নান্দেজ, ফলে ১০ জনের দল নিয়ে অতিরিক্ত সময় খেলতে হয় আর্জেন্টিনাকে। এই সুযোগ কাজে লাগায় স্পেন—বদলি খেলোয়াড় ফেরান তোরেস ১০৬ মিনিটে নিকো উইলিয়ামসের হেড থেকে বল পেয়ে দলকে এগিয়ে দেন। শেষ পর্যন্ত ১-০ গোলে জিতে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় স্পেন।
এমিলিয়ানো মার্তিনেজ পুরো ম্যাচে ১১টি সেভ করেন, যা এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তবু ম্যাচ সেরা হন স্পেনের রদ্রি, যিনি মাঝমাঠ থেকে পুরো টুর্নামেন্টে দলের রক্ষণকে সংগঠিত রাখেন। লাল-হলুদ কার্ডের হিসেবে এনজো ফার্নান্দেজের লাল কার্ডই ছিল ফাইনালের সবচেয়ে বড় মোড় ঘোরানো ঘটনা। কৌশলগতভাবে স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে বল দখলে রেখে আর্জেন্টিনাকে চাপে রাখার কৌশল নেন, আর আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি রক্ষণ জমাট রেখে পাল্টা আক্রমণের অপেক্ষায় ছিলেন—শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত খেলোয়াড়ের সুবিধা নিয়ে জয় নিশ্চিত করে স্পেন।
চূড়ান্ত অবস্থান
চূড়ান্ত অবস্থান
| র্যাঙ্ক | দেশ | অবস্থান |
|---|---|---|
| 🥇 ১ | 🇪🇸 স্পেন | চ্যাম্পিয়ন |
| 🥈 ২ | 🇦🇷 আর্জেন্টিনা | রানার্স-আপ |
| 🥉 ৩ | 🏴 ইংল্যান্ড | তৃতীয় স্থান |
| ৪ | 🇫🇷 ফ্রান্স | চতুর্থ স্থান |
| ৫–৮ | 🇲🇦 মরক্কো 🇧🇪 বেলজিয়াম 🇳🇴 নরওয়ে 🇨🇭 সুইজারল্যান্ড | কোয়ার্টার ফাইনাল |
| ৯–১৬ |
🇨🇦 কানাডা 🇵🇾 প্যারাগুয়ে 🇧🇷 ব্রাজিল 🇲🇽 মেক্সিকো 🇵🇹 পর্তুগাল 🇺🇸 যুক্তরাষ্ট্র 🇪🇬 মিসর 🇨🇴 কলম্বিয়া | রাউন্ড অব ১৬ |
উল্লেখ্য, এই বিশ্বকাপে পুরস্কারের অর্থমূল্যও ছিল রেকর্ড। মোট প্রায় ৮৭.১ কোটি ডলার বিতরণ করা হয়েছে ৪৮টি দলের মধ্যে, যেখানে চ্যাম্পিয়ন দল পেয়েছে ৫ কোটি ডলার আর অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দল পেয়েছে সর্বনিম্ন ১০ মিলিয়ন ডলার যোগ্যতা অর্জনের অর্থ।
বিশ্বকাপ ২০২৬-এর গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| মোট ম্যাচ | ১০৪টি |
| মোট গোল (সেমিফাইনাল পর্যন্ত) | প্রায় ২৯৪টি (১০১ ম্যাচে); তৃতীয় স্থান নির্ধারণী (৬-৪) ও ফাইনালের গোল যোগ হয়ে চূড়ান্ত সংখ্যা আরও বেশি |
| প্রতি ম্যাচে গোল | প্রায় ২.৯ |
| সবচেয়ে বড় জয় | বেলজিয়াম ৪-১ যুক্তরাষ্ট্র (রাউন্ড অব ১৬), সেনেগাল ৫-০ ইরাক (গ্রুপ পর্ব) |
| সবচেয়ে বেশি গোলের ম্যাচ | ইংল্যান্ড ৬-৪ ফ্রান্স (তৃতীয় স্থান নির্ধারণী) |
| সর্বোচ্চ দর্শক উপস্থিতি (একক ম্যাচ) | ৮০,৬৬৩ (ফাইনাল, মেটলাইফ স্টেডিয়াম) |
| মোট দর্শক উপস্থিতি | ৬২ লাখেরও বেশি — বিশ্বকাপ ইতিহাসের রেকর্ড, ১৯৯৪ যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপের আগের রেকর্ড ছাড়িয়ে |
| স্টেডিয়াম দর্শকপূর্ণতার হার | ৯৯.৭% |
ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান
সর্বোচ্চ গোলদাতা
| ক্রম | খেলোয়াড় | দেশ | গোল |
|---|---|---|---|
| ১ | কিলিয়ান এমবাপ্পে | ফ্রান্স | ১০ |
| ২ | লিওনেল মেসি | আর্জেন্টিনা | ৮ |
| ৩ | জুড বেলিংহ্যাম | ইংল্যান্ড | ৭ |
| ৪ | আর্লিং হালান্ড | নরওয়ে | ৭ |
| ৫ | হ্যারি কেইন | ইংল্যান্ড | ৬ |
| ৬ | উসমান দেম্বেলে | ফ্রান্স | ৬ |
এই টুর্নামেন্টেই লিওনেল মেসি তার ক্যারিয়ারের ২১তম বিশ্বকাপ গোল করে নিজেকে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন, আর এমবাপ্পে ১৯ গোল নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে থাকেন।
গোল্ডেন গ্লাভস ও রক্ষণাত্মক পরিসংখ্যান
স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমন পুরো টুর্নামেন্টে আট ম্যাচে মাত্র একটি গোল হজম করেন (বেলজিয়ামের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে) এবং সাতটি ক্লিন শিট রাখেন—সেভের হার ৯০.৯%। কোয়ার্টার ফাইনালের আগ পর্যন্ত টানা ৬০৯ মিনিট গোল হজম না করে তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের রেকর্ড গড়েন, যা ১৯৯০ বিশ্বকাপে ইতালির ওয়াল্টার জেঙ্গার ৫১৭ মিনিটের পুরনো রেকর্ড ভেঙে দেয়।
পুরস্কার বিজয়ী
| 🏅 পুরস্কার | বিজয়ী ও বিস্তারিত |
|---|---|
| 🌟 গোল্ডেন বল | 🇪🇸 রদ্রি (স্পেন)
🥈 সিলভার বল: লিওনেল মেসি 🥉 ব্রোঞ্জ বল: কিলিয়ান এমবাপ্পে |
| ⚽ গোল্ডেন বুট | 🇫🇷 কিলিয়ান এমবাপ্পে
⚽ ১০ গোল 🎯 ৪ অ্যাসিস্ট 🔥 টানা দ্বিতীয়বার এই পুরস্কার জিতলেন |
| 🧤 গোল্ডেন গ্লাভস | 🇪🇸 উনাই সিমন
🥅 ৭টি ক্লিন শিট ⚽ মাত্র ১ গোল হজম |
| ⭐ সেরা তরুণ খেলোয়াড় | 🇪🇸 পাউ কুবারসি
🎂 বয়স: ১৯ বছর |
| 🤝 ফেয়ার প্লে পুরস্কার | 🇳🇱 নেদারল্যান্ডস
নকআউট পর্বে ওঠা দলগুলোর মধ্যে সেরা শৃঙ্খলা রেকর্ড। |
উল্লেখযোগ্য রেকর্ড
- সবচেয়ে বেশি গোল (ক্যারিয়ার): লিওনেল মেসি — বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ ২১ গোল করে রেকর্ড গড়েন।
- সবচেয়ে কম গোল খাওয়া চ্যাম্পিয়ন: স্পেন — পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র ১টি গোল হজম করে শিরোপা জেতে, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম।
- বিশ্বকাপের ৩০০০তম গোল: আর্জেন্টিনার এনজো ফার্নান্দেজ, মিসরের বিপক্ষে রাউন্ড অব ১৬-তে।
- ফাইনালে সর্বোচ্চ সেভ: এমিলিয়ানো মার্তিনেজ (আর্জেন্টিনা) — ১১টি সেভ, ফাইনালের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
- সবচেয়ে বেশি বয়সে হ্যাটট্রিক: লিওনেল মেসি, আলজেরিয়ার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে।
- আফ্রিকান দলের রেকর্ড: সেনেগাল ইরাকের বিপক্ষে ৫-০ গোলে জিতে আফ্রিকান দলের সর্বোচ্চ ব্যবধানের জয় ও গ্রুপ পর্বে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড গড়ে।
- কনক্যাকাফ রেকর্ড: মেক্সিকো টানা চারটি বিশ্বকাপ ম্যাচ জিতে অঞ্চলের রেকর্ড গড়ে।
- রোনালদোর বিদায়: ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করা প্রথম খেলোয়াড় হন, তবে স্পেনের কাছে হেরে রাউন্ড অব ১৬-তেই তার শেষ বিশ্বকাপ শেষ হয়।
- দর্শক উপস্থিতির নতুন রেকর্ড: ৬২ লাখেরও বেশি মোট দর্শক, ১৯৯৪ বিশ্বকাপের পুরনো রেকর্ড ভেঙে।
- নতুন ফরম্যাট রেকর্ড: প্রথমবারের মতো ৪৮ দল, তিন আয়োজক দেশ ও ১০৪ ম্যাচের বিশ্বকাপ।
চ্যাম্পিয়ন দলের পথচলা
স্পেনের শিরোপা জয়ের যাত্রা ছিল মূলত রক্ষণাত্মক দৃঢ়তার এক গল্প।
- গ্রুপ পর্ব: গ্রুপ H-এ কেপ ভার্দে, সৌদি আরব ও উরুগুয়ের বিপক্ষে খেলে গ্রুপ সেরা হয়ে ওঠে স্পেন, একটি গোলও হজম না করে।
- Round of 32: অস্ট্রিয়াকে ৩-০ গোলে হারায়— ওইয়ারসাবাল জোড়া গোল (৩৬’, ৮৯’) ও পেদ্রো পোরোর একটি গোল।
- Round of 16: পর্তুগালকে ১-০ গোলে হারায়, মিকেল মেরিনোর ইনজুরি-টাইম গোলে—এই হারেই শেষ হয় রোনালদোর বিশ্বকাপ যাত্রা।
- Quarter Final: বেলজিয়ামের বিপক্ষে ২-১ গোলে জয়—ফাবিয়ান রুইজ এগিয়ে দেন (৩০’), দে কেতেলার সমতা ফেরান (৪১’), শেষে মেরিনোর জয়সূচক গোল (৮৮’)।
- Semi Final: ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারায়—ওইয়ারসাবালের পেনাল্টি গোলসহ।
- Final: আর্জেন্টিনাকে অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলে হারিয়ে শিরোপা নিশ্চিত করে, ফেরান তোরেসের ১০৬ মিনিটের গোলে।
টুর্নামেন্টের সেরা মুহূর্ত
- ফেরান তোরেসের অতিরিক্ত সময়ের গোলে স্পেনের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয় নিশ্চিত হওয়া।
- এমিলিয়ানো মার্তিনেজের ফাইনালে রেকর্ড ১১টি সেভ, তবু দলকে শিরোপা বাঁচাতে না পারা।
- তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ড-ফ্রান্সের ৬-৪ গোলের রোমাঞ্চকর লড়াই।
- মেসির ২১তম বিশ্বকাপ গোল করে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া।
- জার্মানি ও নেদারল্যান্ডস—দুই ফুটবল পরাশক্তির রাউন্ড অব ৩২-তেই টাইব্রেকারে বিদায়।
- নরওয়ের হয়ে আর্লিং হালান্ডের জোড়া গোলে ব্রাজিলের বিদায়, যা টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় চমকগুলোর একটি।
- ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, নেইমার ও গিয়ের্মো ওচোয়ার বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের সমাপ্তি।
- এনজো ফার্নান্দেজের গোলে বিশ্বকাপ ইতিহাসের ৩০০০তম গোল উদযাপন।
- তিন আয়োজক দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মেক্সিকো—সবাই রাউন্ড অব ১৬-তে বিদায় নেওয়া।
- ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে আর্জেন্টিনার এনজো ফার্নান্দেজের লাল কার্ড, যা ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
আরও পড়ুন
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকা
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ প্রাইজ মানি
- ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ চূড়ান্ত: বিস্তারিত ম্যাচ প্রতিবেদন
- স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী দলের সম্পূর্ণ স্কোয়াড বিশ্লেষণ
- লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ ক্যারিয়ার: এক নজরে
- ফিফা বিশ্বকাপ ২০৩০: আয়োজক, সময়সূচি ও প্রস্তুতি
- বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা ফাইনালগুলো
- ৪৮ দলের নতুন ফরম্যাট: কী বদলাল আর কেন?
- গোল্ডেন বুট জয়ীদের ইতিহাস: ১৯৩০-২০২৬
- বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব থেকে ফাইনাল: পরিসংখ্যানে এক নজর
FAQ — ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬
প্রশ্ন: ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ কে জিতেছে?
উত্তর: স্পেন। তারা ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলে হারিয়ে ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো ফিফা বিশ্বকাপের শিরোপা জেতে।
প্রশ্ন: ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ ফাইনালের ফলাফল কী ছিল?
উত্তর: ১৯ জুলাই নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে স্পেন অতিরিক্ত সময়ে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারায়। ম্যাচের একমাত্র গোলটি করেন ফেরান তোরেস (১০৬’)।
প্রশ্ন: ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সর্বোচ্চ গোলদাতা কে ছিলেন?
উত্তর: ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে। তিনি ১০ গোল করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন।
প্রশ্ন: গোল্ডেন বল (সেরা খেলোয়াড়) কে জিতেছেন?
উত্তর: স্পেনের রদ্রি টুর্নামেন্টজুড়ে অসাধারণ পারফরম্যান্সের জন্য গোল্ডেন বল (সেরা খেলোয়াড়) পুরস্কার জেতেন।
প্রশ্ন: গোল্ডেন বুট কে পেয়েছেন?
উত্তর: কিলিয়ান এমবাপ্পে। তিনি ১০ গোল ও ৪টি অ্যাসিস্ট করে টানা দ্বিতীয়বার গোল্ডেন বুট জেতেন।
প্রশ্ন: গোল্ডেন গ্লাভস কে জিতেছেন?
উত্তর: স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমন। তিনি টুর্নামেন্টে ৭টি ক্লিন শিট রাখেন এবং মাত্র ১টি গোল হজম করেন।
প্রশ্ন: ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এ মোট কতটি গোল হয়েছে?
উত্তর: সেমিফাইনাল পর্যন্ত ১০১ ম্যাচে ২৯৪টি গোল হয়েছিল। এরপর তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ১০টি এবং ফাইনালে ১টি গোল হওয়ায় মোট গোলসংখ্যা আরও বেড়ে যায়। এটি ৪৮ দলের ফরম্যাটে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ গোলসংখ্যার আসর হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রশ্ন: ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এ কোন দল সবচেয়ে বেশি গোল করেছে?
উত্তর: রাউন্ড অব ১৬ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা দলগতভাবে সর্বোচ্চ ১৪টি গোল করেছিল এবং ওই পর্যায়ে সর্বোচ্চ গোল করা দল ছিল।
প্রশ্ন: ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এ তৃতীয় স্থান কোন দল অর্জন করেছে?
উত্তর: ইংল্যান্ড। তারা তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ফ্রান্সকে ৬-৪ গোলে হারিয়ে তৃতীয় স্থান নিশ্চিত করে, যা ইংল্যান্ডের গত ৬০ বছরের সেরা বিশ্বকাপ ফলাফল।
উপসংহার
৪৮ দলের নতুন ফরম্যাটে অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকে উপহার দিয়েছে রেকর্ড গোল, রেকর্ড দর্শক আর অসংখ্য নাটকীয় মুহূর্ত। স্পেনের রক্ষণাত্মক দৃঢ়তা, আর্জেন্টিনার লড়াকু মানসিকতা, আর তরুণ প্রতিভা পাউ কুবারসির উত্থান—সব মিলিয়ে এই আসর ফুটবল ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। লিওনেল মেসির এটাই ছিল শেষ বিশ্বকাপ, ফলে একটি যুগের সমাপ্তিও ঘটল এই টুর্নামেন্টের মধ্য দিয়ে। এখন সবার নজর থাকবে ২০৩০ বিশ্বকাপের দিকে, যেটি অনুষ্ঠিত হবে স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কোর যৌথ আয়োজনে (উদ্বোধনী কিছু ম্যাচ দক্ষিণ আমেরিকাতেও), যেখানে স্পেন নামবে টানা দ্বিতীয় শিরোপা ধরে রাখার লক্ষ্য নিয়ে।


